🕋 রমজানে তাহাজ্জুদের অপার ফজিলত: রহমতের দ্বার উন্মোচন
রমজান এমন এক মাস, যেখানে মুমিনদের জন্য অফুরন্ত রহমত, মাগফিরাত ও জান্নাতের দাওয়াত অপেক্ষা করছে। এই মাসে আল্লাহ তায়ালা সামান্য আমলের বিনিময়ে অগণিত সওয়াব প্রদান করেন। এটি আত্মশুদ্ধি, গুনাহ থেকে মুক্তি এবং তাকওয়া অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়।অন্য মাসে সঠিক সময় তাহাজ্জু আদায় করতে না পারলেও রমজানে সুবিধা আছে । সেহরি খেতে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করা কোনে কঠিন কাজ না। তাহাজ্জুত সালাতে আছে অফুরোন্ত নেয়ামত। তাহাজ্জুতের সালাত একটি নামাজ যে এই নাতাজ আদায় করবে আল্লাহ তায়ালা তাকে সম্মানিত করবেন।
আসুন আমরা জেনে নেই তাহাজ্জুতে গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে।
একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—
"রমজান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল ইবাদত করলো, সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ ইবাদত করলো। আর যে ব্যক্তি রমজানে একটি ফরজ আদায় করলো, সে যেন অন্য মাসে ৭০টি ফরজ আদায় করলো।"
📖 (শুআবুল ঈমান: ৩/৩০৫-৩০৬)
এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা কি কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে?
নফল ইবাদতের গুরুত্ব
ফরজ ইবাদত পালনের পর নফল ইবাদত একটি বান্দার জন্য অতিরিক্ত পুরস্কার বয়ে আনে। শুধু তাই নয়, কিয়ামতের দিন যখন ফরজ ইবাদতের ঘাটতি পাওয়া যাবে, তখন আল্লাহ তায়ালা নফল ইবাদতের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করবেন।
হাদিসে এসেছে—
"কিয়ামতের দিন বান্দার যে কাজের হিসাব সর্বপ্রথম নেয়া হবে, তা হলো নামাজ। যদি তা সঠিক হয়, তাহলে সে পরিত্রাণ পাবে। আর যদি ত্রুটি থাকে, তবে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি তার ফরজ ইবাদতে ঘাটতি থাকে, তবে আল্লাহ বলবেন, 'আমার বান্দার কিছু নফল ইবাদত আছে কি না, যা দিয়ে ফরজের ঘাটতি পূরণ করা যেতে পারে?'"
📖 (আবু দাউদ ৮৬৪, তিরমিজি ৪১৩, ইবনে মাজাহ ১৪২৫)
তাহলে আমাদের উচিত, নফল ইবাদতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, বিশেষ করে রমজানের মতো পুণ্যময় মাসে!
তাহাজ্জুদের ফজিলত ও গুরুত্ব
নফল ইবাদতের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সালাতুত তাহাজ্জুদ (রাতের নামাজ)। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি কখনোই পরিত্যাগ করতেন না।
তাহাজ্জুদ নামাজ ‘কিয়ামুল লাইল’ নামেও পরিচিত।এটি ফরজ নয়, তবে নবী (সা.) নিয়মিত আদায় করতেন ও সাহাবাদের উৎসাহিত করতেন।রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহতায়ালা প্রথম আসমানে নেমে আসেন ও বান্দাদের দোয়া কবুল করেন।রমজানে সেহরির জন্য ওঠার কারণে তাহাজ্জুদ পড়া সহজ হয়।
তিনি বলেছেন—
"ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম ইবাদত হলো রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ)।"
📖 (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
তাহাজ্জুদ নামাজের সময় আল্লাহ পৃথিবীর নিকটতম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাক দেন—
"কে আছো আমার কাছে প্রার্থনাকারী? আমি তার প্রার্থনা কবুল করবো। কে আছো ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করবো। কে আছো আমার কাছে কিছু চাওয়ার? আমি তাকে তা দান করবো।"
📖 (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৪৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৫৮)
এমন সুযোগ যদি কেউ হাতছাড়া করে, তবে সে নিঃসন্দেহে বিরাট ক্ষতিগ্রস্ত!
রাসূল (সা.) ও তাহাজ্জুদ
তাহাজ্জুদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। তিনি এত দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তেন যে, তার পা ফুলে যেত।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন:
"রাসূল (সা.) রাতে এত দীর্ঘ সালাত আদায় করতেন যে, তার পা ফুলে যেত। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার তো পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হয়েছে, তাহলে এত কষ্ট করেন কেন?' তিনি বললেন, 'আমি কি তবে কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?'"
📖 (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৩৭)
রমজানের শেষ দশকে তাহাজ্জুদের প্রতি রাসূল (সা.)-এর আগ্রহ আরো বেড়ে যেত। তিনি রাত্রিজাগরণ করতেন এবং পরিবারের সদস্যদেরও ইবাদতের জন্য ডাকতেন।
"রমজানের শেষ দশকে রাসূলুল্লাহ (সা.) রাতে জেগে থাকতেন, তার পরিবারকে জাগিয়ে দিতেন এবং লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন (পূর্ণ ইবাদতে মগ্ন হওয়ার সংকল্পে)।"
📖 (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
তাহাজ্জুদ নামাজের গুণাবলি ও উপকারিতা
❖ গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যম
রাসূল (সা.) বলেন:
"রাতের নামাজ (তাহাজ্জুদ) তোমাদের পূর্ববর্তী নেককার লোকদের অভ্যাস। এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম, পাপ মোচনের উপায়, এবং নৈতিক স্খলন থেকে রক্ষার ঢাল।"
📖 (তিরমিজি: ৩৫৪৯, ইবনে খুজাইমা: ১১৩৫)
❖ কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হবে
রাসূল (সা.) বলেন:
"কিয়ামতের দিন নামাজ সুপারিশ করবে এবং বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক! আমি এই ব্যক্তিকে রাতের বেলায় ঘুমাতে দিইনি, সে আপনার সন্তুষ্টির জন্য দাঁড়িয়ে ছিল।' তখন তার সুপারিশ কবুল হবে।"
📖 (তিরমিজি: ২/১০৮)
❖ আল্লাহ তিন ব্যক্তির ওপর সন্তুষ্ট হন
রাসূল (সা.) বলেন:
"তিন ব্যক্তির ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট হন—
১️⃣ যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদের জন্য রাতে জাগে।
২️⃣ যারা একসঙ্গে কাতারবদ্ধ হয়ে সালাত আদায় করে।
৩️⃣ যারা শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য সারিবদ্ধ হয়।"
📖 (শরহুস সুন্নাহ, মিশকাত: ১০৯, হাদিস: ১১৫৭)
আরো পড়ুন
💖 ঈদের প্রস্তুতি হোক আত্মশুদ্ধি, মানবতা ও ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি
রমজানে রোজা রাখার জন্য ওষুধ খেয়ে মাসিক বন্ধ রাখা কি শরিয়তসম্মত?
সাদকাতুল ফিতর এর বিস্তারিত বর্ণনা: ঈদের খুশিতে সামিল হোক দরিদ্রেরাও
তাহাজ্জুদের পুরস্কার ও গুনাহ মাফের সুযোগ
রমজানে নফল ইবাদতের সওয়াব ফরজের সমান এবং ফরজের সওয়াব সত্তর গুণ বৃদ্ধি করা হয়।
নবী (সা.) বলেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের তাহাজ্জুদ।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
যারা ইমান ও সওয়াবের আশায় তাহাজ্জুদ আদায় করে, তাদের পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করা হয়।
রমজানে নফল ইবাদতের সওয়াব ফরজের সমান এবং ফরজের সওয়াব সত্তর গুণ বৃদ্ধি করা হয়।
নবী (সা.) বলেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বশ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের তাহাজ্জুদ।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
যারা ইমান ও সওয়াবের আশায় তাহাজ্জুদ আদায় করে, তাদের পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করা হয়।
তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম
☑ সাহরি খাওয়ার আগের সময় তাহাজ্জুদের জন্য উত্তম।
☑ অজু ও মিসওয়াক করে একাগ্রচিত্তে নামাজ শুরু করা উচিত।
☑ কমপক্ষে ২ রাকাত ও সর্বোচ্চ ১২ রাকাত আদায় করা যায়।
☑ যত বেশি রাকাত পড়া হবে, তত বেশি সওয়াব লাভ করা যাবে।
দীর্ঘ সুরা তিলাওয়াত করা উত্তম, তবে সংক্ষিপ্তও পড়া যায়।
রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন:
"যদি কোনো কারণে তাহাজ্জুদ ছুটে যায়, তবে দিনের বেলায় ১২ রাকাত নামাজ আদায় করলে তাহাজ্জুদের সওয়াব পাওয়া যাবে।"
📖 (মুসলিম শরিফ: ১৬৪০)
আরো ইনফো পড়ুন
শেষ কথা
রমজান হচ্ছে তাকওয়া অর্জনের মাস। এই মাসে ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল ইবাদতের প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তাহাজ্জুদ নামাজের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর আরও বেশি নৈকট্য লাভ করতে পারি। তাহাজ্জুদ নামাজের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভ করতে পারি। মাহে রমজানে আমাদের উচিত এই নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সারা জীবনের জন্য তা ধরে রাখা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই বরকতময় ইবাদত নিয়মিত আদায় করার তাওফিক দান করুন। তাই আসুন, আমরা সবাই রমজানের এই বরকতময় মুহূর্তগুলো কাজে লাগিয়ে আমাদের গুনাহ মাফ করিয়ে নেই এবং জান্নাতের পথে নিজেদের প্রস্তুত করি।
🌿 আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাহাজ্জুদ পড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন! 🤲